সারি সারি সবুজ পাহাড়ের ফাঁকে আনমনে ঘুরে বেড়ায় ছন্নছাড়া মেঘের দল। অবিরাম বৃষ্টিতে পাহাড়ের বৃক্ষরাজি লাভ করে নবযৌবন। পাহাড়ের বুক চিরে শত শত ঝর্ণা দেখতে চাইলে বর্ষাকালের বিকল্প নেই। বর্ষায় প্রকৃতি যেন তার সবটুকু রূপ ঢেলে দেয় বান্দরবান জুড়ে। উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে মেঘ স্পর্শ করার ইচ্ছে হলে ভ্রমণের জন্য নির্দ্বিধায় বেছে নিতে পারেন বান্দরবানকে।

শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে দেখতে পাবেন ১৮০০ফিট উঁচু নীলাচল থেকে সবুজের চাদরে ঢাকা বান্দরবানকে আর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদী। নীলাচল পর্যটন কেন্দ্রের একেবারে চূড়ায় পর্যটকদের জন্য আছে বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। নীলাচলের মূল পাহাড়ের শিখরের চারপাশেই মনোরম স্থাপনা শৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে এসব কেন্দ্র। একটি থেকে আরেকটি একেবারেই আলাদা। আর একেক দিক থেকে পাহাড়ের দৃশ্যও একেক রকম। বর্ষা এবং বর্ষা পরবর্তী সময়ে এখানে চলে মেঘের খেলা। কিছুক্ষণ পর পরই দূর পাহাড় থেকে মেঘের ভেলা ভেসে আসে নীলাচলের চূড়ায়। চারপাশ ঢেকে ফেলে শীতল নরম পরশে।

বান্দরবান-চিম্বুক রোডের ৮ কিলোমিটারে রয়েছে পাহাড়ি ঝর্ণা শৈলপ্রপাত ও ২৬ কিলোমিটার দূরে রয়েছে চিম্বুক পাহাড়। বান্দরবন শহর থেকে নীলগিরি যাওয়ার পথে এই দুটি স্পটে যাত্রাবিরতি আপনাকে দিতে পারে শান্তির কোমল পরশ। দৃঢ়তা আর সবুজের অপার আয়োজন নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে সুবিশাল সব পাহাড়। এর মাঝে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে পিচঢালা সড়ক। কখনো উঁচুতে উঠছে, কখনোবা ঢাল বেয়ে এঁকেবেঁকে গড়িয়ে চলা বাহনে পাহাড়ি পথের বুকে হিম ধরানো বাঁকগুলো পার হওয়ার সময় বুঝি যাত্রীদের কারও ঝুঁকির কথা মনে পড়ে না। কারন, সবাই প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্য মেঘবালিকা আর পাহাড়ের প্রেম উপভোগে ব্যস্ত।

কিছুদুর যাওয়ার পরেই হঠাৎ ঢুকে পরবেন ছায়ার টানেলে, গায়ে লাগতে শুরু করবে ভেজা ঠান্ডা হাওয়ার পরশ। বুঝে যাবেন আপনি মেঘের রাজ্যে প্রবেশ করেছেন। ঘরের বাঁধন ছেড়ে প্রকৃতির মাঝে শান্তির খোঁজে আসা লোকজনের আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন কিঞ্চিত পূরণ হতে চলেছে। আপনি পৌঁছে গেছেন আকাশের খুব কাছাকাছি নীলগিরি। নীলগিরির চূড়া থেকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় কেওক্রাডং, প্রাকৃতিক আশ্চর্য বগালেক, কক্সবাজারের সমুদ্র, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের আলো-আঁধারি বাতি এবং চোখ জুড়ানো পাহাড়ের সারি দেখতে পাওয়া যায়। চোখে পড়ে পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে চলা সর্পিল সাঙ্গু নদী। সাঙ্গুর বুক চিরে বয়ে চলা ছোট ছোট নৌকাগুলোকে দেখলে দূর থেকে মনে হবে স্বপ্নের কোন ডিঙি বয়ে চলছে সাঙ্গু নদী দিয়ে। চারপাশে ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়ের মিছিল। কখনও মাথায় উপরে মেঘের নৃত্য কখনও বা রোদ-ছায়ায় সূর্যের লুকোচুরি। ঝুপ করে আকাশ ভেঙে নেমে আসা ঝমাঝম বৃষ্টি দেখে মন চলে যায় অন্য পৃথিবীতে। মেঘ পাহাড়ের রাজ্যে এসে বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হতে হয় সবাইকে। নীলগিরির রাতের আকাশে লক্ষ কোটি তারার সৌন্দর্য আরো হতবাক করে। পাহাড়গুলোর মাঝে আলো-আঁধারির খেলা দেখে আপনার জীবনকেই যেন রহস্যময় বলে মনে হতে পারে। আর এমন একটি দুর্লভ অনুভুতি অনুভব করতে চাইলে একটি রাত কাটিয়ে দিতে পারেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনি পরিচালিত নীলগিরি হিল রিসোর্টে।

নীলগিরি থেকে বের হয়ে আরও ঘণ্টা খানেক যাওয়ার পর প্রকৃতি যেন একে একে মেলে ধরে সযত্নে গচ্ছিত সব উপহার। দূর থেকে দেখে মনে হয় প্রতিটি সবুজ পাহাড়ের চূড়া থেকে বের হচ্ছে আগ্নেয়গিরির ধোঁয়া। একটু কাছে যেতেই ভুল ভাঙে সবার। অবাক চোখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন ভ্রমণপিপাসু লোকজন। সবুজ পাহাড় বুকে টেনে নিচ্ছে শুভ্র মেঘবালিকাদের। আর মেঘদল যেন মমতার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে পাহাড়ের চূড়ায়। কিছুক্ষণ এ দৃশ্য দেখার পর বাঁক ঘুরতেই দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে যায় মেঘ আর পাহাড়ের প্রেমের এই দৃশ্য। নিচে তখন রৌদ্র–ছায়ার খেলা। হঠাৎ বিচ্ছেদে মন খারাপ হয়। এই খারাপ লাগা স্থায়ী হওয়ার সুযোগ পায় না। বাঁক ঘুরতেই আবার সামনে এসে পড়ে মন ভরানো দৃশ্য। কারণ ওই দূরে পাহাড়কে আবার ভালোবাসার আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে মেঘবালিকা। অদ্ভুত সুন্দর এ প্রেম দেখতে দেখতে কখন যে থানচি স্টেশনে গাড়ি এসে থেমেছে সেদিকে খেয়াল রাখার জো নেই। থানচিতে রয়েছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত পাকা সড়ক, সাহস থাকলে ঘুরে আসতে পারেন। বান্দরবনের থানচি-আলীকদমের ৩৩ কিমি এর এই রোডটি আবার ডিম পাহাড় নামে বেশি পরিচিত । থানচি থেকে পাহাড়ের পাশ কেটে উঠে গেছে উচু থেকে উচুতে । এই রাস্তা থেকে আপনি যেদিকে থাকান শুধু সবুজ আর সবুজ । আপনার মনে হবে আপনি যেন মেঘের উপর ভাসছেন। নিচের ঘরবাডি দেখলে মনে হবে যেন ছোট ছোট খেলনার ঘরবাড়ি এমনকি শংখ নদীকে ও দেখতে মনে হবে সাপের মত ।

যাদের পাহাড়ে ট্রেকিং করতে কষ্ট হয় বা গহীনে যেতে ভয় লাগে কিংবা ফ্যামিলি নিয়ে বা বন্ধুরা মিলে যারা প্রথমবারের মত বান্দরবান যাবেন এবং সহজেই বান্দরবানের সবচাইতে জনপ্রিয় ও যাতায়াত-সুবিধা সম্বলিত জায়গাগুলো ঘুরে আসতে চান তাদের জন্যে এটুকুই। তবে বান্দরবানের গহীনে যে আরও কত দারুণ দারুণ জায়গা আছে তা আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই জানেনা । এইসব জায়গায় ফ্যামিলি নিয়ে যাওয়া যাবেনা, যারা অ্যাডভ্যাঞ্চার পছন্দ করেন, যে কোন প্রতিকূল পরিস্থিতিকে হাসি মুখে মেনে নিতে পারেন তাদের জন্যেই এই অসাধারণ জায়গাগুলো । থানচির পরে ওই গহীন জায়গাগুলোতে রয়েছে বাংলাদেশের নায়াগ্রা খ্যাত – নাফাকুম, আমিয়াকুম, সাতভাইকুম- সৌন্দর্য যেখানে বাঁধনহারা !